মাইজভান্ডার দরবার শরীফ সম্পর্কে বিস্তারিত

'মাইজভান্ডার দরবার শরীফ : ইসলাম ধর্মে আধ্যাত্মিক সাধনার ধারাবাহিকতায় উনবিংশ শতাব্দির মধ্যভাগে  গাউছুল আজম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী কাদ্দাছাল্লাহু ছিরহুল আজিজ] আল্লাহ্‌ প্রদত্ত আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও শক্তি এবং কোরআন-হাদীসের শিক্ষাকে ধারন করে প্রতিষ্ঠা করেন মাইজভান্ডারী কাদেরিয়া ত্বরিকা। আর সেই কাদেরিয়া ত্বরিকাকে বর্তমানে মাইজভান্ডার দরবার শরীফ বলা হয়ে থাকে। মাইজভান্ডার দরবার শরীফ, চট্টগ্রামের, ফটিকছড়ি উপজেলার মাইজভান্ডার গ্রামেই অবস্থিত।

হযরত আহমদ উল্লাহ্‌ (ক:) এর রওজা

==মাইজভান্ডারী ত্বরিকা==

 

‘ত্বরিকত’ মানে আল্লাহ্‌র দিকে বান্দার প্রত্যাবর্তনের পথ। এই পথের দুটি দিক রয়েছে। জাহের ও বাতেন। বাহ্যিক শরিয়ত পালনের মাধ্যমে বান্দা তার জাহের কে পবিত্র করে আর সাথে সাথে আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে হাকিকতে শরীয়ত ও ধর্ম পালনের নিগুঢ়তম উদদেশ্য সাধনে ব্রতি হয়। এই চর্চাই সূফী ত্বরিকার মৌলিক ভাব। ‘ত্বরিকা ইসলাম ধর্মে কোন নব আবিষ্কার নয়। ইসলামের প্রথম যুগে আধ্যাত্মিক সাধনার ছায়ায় ত্বরিকতের হাকিকত বর্তমান ছিল। হযরত রাসুল (ﷺ) সাহাবাদের কে ধর্মীয় দিক নির্দেশনার অংশ হিসেবে আধ্যাত্মিক সাধনার তালীম ও তারবীয়ত দিয়েছেন। এমন কি বায়াতে ইসলাম গ্রহনের পর ও সাহাবাদের কাছ থেকে হযরত রাসুল (ﷺ) বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যাপারে পুনঃ বায়াত গ্রহন করেছেন।

 

আল্লাহ্‌তায়লা পবিত্র কোরআন এ বলেছেন “যারা আমার পথে সাধনা করে, অবশ্যই আমি তাদেরকে আমার অনেক গুলো পথ প্রদর্শন করবো। নিশ্চই আল্লাহ্‌তায়লা ইহসানকারীদের সাথে আছেন”। (সুরা আনকাবুত, ৬৯)।

এই আয়াতে আল্লাহ্‌ তায়লা অনেক গুলো পথ প্রদর্শন এর কথা বলেছেন, কিন্তূ প্রশ্ন থাকতেই পারে !

কি সেই পথ ???

কিভাবে পাবো সেই পথের ঠিকানা ???

 

পবিত্র কোরআন মাজিদে আল্লাহ্‌ তায়লা বলেন, "হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর নৈকট্য লাভের উসিলা অন্বেষণ করো, আর তাঁর পথে জিহাদ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" (সূরা আল মায়িদা ৩৫)

 

এই আয়াতের মাধমে আমরা বুঝতে পারি, আল্লাহ্‌র নৈকট্য পেতে হলে আমাদের উসিলা তালাশ করতে আর উসিলা হচ্ছে পীর-আউলিয়া এবং ওলীদের বোঝানো হয়েছে। আর উসিলা খুঁজে পেলে আপন নফসের সঙ্গে জিহাদ করার মাধ্যমেই আল্লাহ্‌র নৈকট্য পাওয়া সম্ভব, ইন শাঁ আল্লাহ্‌।

 

== মাইজভান্ডারী ত্বরিকার বৈশিষ্ট্য ==

 

মাইজভান্ডারী ত্বরিকা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ইসলামি ভাবাদর্শকে পরিপূর্ণভাবে আত্মস্থ করার পাশাপাশি একই সাথে অসামম্প্রদায়িক, উদার ও সংস্কারমুক্ত, নৈতিক ধর্ম-প্রাধান্যসম্পন্ন, শ্রেনী-বৈষম্যহীন ও মানবদরদী ।

 

== মাইজভান্ডারী ত্বরিকার মূল লক্ষ্য==

 

রাসুল (স:) এর পবিত্র শাজড়া মোবারক অনুযায়ী বাইত করানোর মাধ্যমে, আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভ করার শিক্ষা দেওয়া।

 

== মাইজভান্ডার দরবার শরীফের বাইতি প্রথা ও শাজড়া মোবারক ==

 

পবিত্র কোরআন মাজিদে, আল্লাহ্‌ বলেন- " হে হাবীব আপনি বিস্ববাসীকে বলে দিন যে, আমি তোমাদের থেকে কোন বিনিময় চাইনা, কিন্তূ আমার আহলে বাইতের মুহাব্বত, সম্মান আমি তোমাদের থেকে চাই। ( সূরা শূরা, ২৩নং আয়াত)।

 

এই আয়াত শরীফ অবতীর্ন হওয়ার পর  হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম উনার আহলে বাইতকে যেভাবে ডেকেছিলেন- " একদিন নবী করীম (স:)- হযরত আলী (রা:), ফাতিমা (রা:), হাছান (র:) ও হোছাইন (র:) কে ডাকলেন, তারা যখন আসলেন তখন নবী করীম (স:) তাদেরকে নিচ চাদর মোবারক দিয়ে ঢেকে ফেললেন এবং বললেন হে আল্লাহ্‌ এরা হলেন আমার আহলে বাইত, এদের থেকে আপনি সকল অপবিত্রতা দূর করে দিন এবং এদেরকে পরিপূর্ণভাবে পবিত্র করুন" ।

 

আহলে বাইতের মর্যাদা সম্বলিত আয়াতটি যখন আবতীর্ন হল তখন সাহাবায়ে কেরাম (র:) রাসুল (স:) এর নুরানী দরবারে অতীব আগ্রহ ও আদবের সাথে জানতে চাইলেন যে, ইয়া রাসুলাল্লাহ (স:) আপনার নিকট আত্মীয় মহান ব্যাক্তিবর্গ কারা ??? যাদের তাজীম ও আন্তরিক ভালোবাসা আল্লাহ্‌ আমাদের উপর ওয়াজিব করে দিয়েছেন। তখন রাসুল (স:) এরশাদ করলেন যে, তারা হলেন হযরত আলী (রা:), ফাতিমা (রা:), হাছান (র:), হোছাইন (র:) ও তারা (হাছান-হোছাইন) উভয়ের সন্তানগণ (বংশধর)।

 

অপর এক হাদিসে '''" আবনা-হুমা "''' শব্দ দ্বারা হাছানী ও হোছাইনী বংশের যত আওলাদে রাসুল (স:) পৃথিবীর বুকে অবস্থান করবেন তাদেরকে সম্মান ও তাজীম করা দুনিয়ার সকল মানুষের উপর ওয়াজিব।

 

মাইজভান্ডার দরবার শরীফের গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিলের বর্তমান সাজ্জাদানশীন পীরে মুকাম্মেল আওলাদে রাসুল (স:) হযরত মওলানা শাহ্‌ সূফী এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী (মাদ্দা জিল্লাহুল আলী) হলেন রাসুল (স:) এর নুরানী শাজরার ধারাবাহিকতার ৩৯তম আওলাদে রাসুল আহলে বায়াত।

 

== সাজ্জাদানশীনে দরবারে গাউছুল আজম ==

 

গাউছুল আজম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (কঃ) ওফাতের পূর্বে আপন নাতী হযরত সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারী (কঃ) কে বালেগ ঘোষনা করে মাইজভান্ডার দরবার শরীফে আধ্যাত্মিক উত্তরাধীকারী নির্ধারন করে যান। হযরত কেবলা কাবা (কঃ) এই প্রসঙ্গে বলেন, “আমার ‘দেলা ময়না’ বালেগ। দেলা ময়না গদীতে বসবে”।

 

সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারী (কঃ) পীর হওয়ার জন্য খেলাফতপ্রাপ্ত হওয়ার শর্তের প্রবক্তা ছিলেন। তার দৃষ্টিতে যিনি আপন পীর সাহেবের কাছ থেকে সরাসরি ও স্পষ্টভাবে খেলাফত পাননি তিনি কাওকে বায়াত দেওয়ার যোগ্য নন।

 

খেলাফত প্রদানপূর্বক সাজ্জাদানশীন মনোনয়ন এর মাধ্যমে গাউছিয়ত জারী রাখার নিয়মের অনুসরণে হযরত সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারী (কঃ) তাঁর জীবদ্দশায় উনার তৃতীয় পুত্র হযরত সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী (মঃ জিঃ আঃ) কে নিজ গদীর উত্তরাধীকারি ও মাইজভান্ডার দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন সাব্যস্ত করে যান। এবং বর্তমান মাইজভান্ডার দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীনে দরবারে গাউছুল আজম হচ্ছেন সাজ্জাদানশীনে দরবারে গাউছুল আজম আলহাজ্ব হযরত মওলানা শাহ সূফী সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী (ম. জি. আ.)।

 

== সংগঠন সমূহ ==

 

* আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউছে মাইজভান্ডারী (শাহ্‌ এমদাদীয়া)

* মাইজভান্ডারী শাহ্‌ এমদাদীয়া সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কমিটি

* গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী রিচার্স ইনস্টিটিউশন

* গাউছিয়া আহমদিয়া এমদাদিয়া খেদমত কমিটি

* মাইজভান্ডারী শাহ্‌ এমদাদীয়া ব্লাড ডোনার্স গ্রুপ

* গাউছিয়া আহমদিয়া এমদাদিয়া ওলামা কমিটি

* মাইজভান্ডারী ফাউন্ডেশন

* মাইজভান্ডারী প্রকাশনী

 

== আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের পথ অথবা সপ্তকর্ম পদ্ধতি ==

 

"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" জিকিরের মাধ্যমে আপন নফস এর সাথে জিহাদ করার মাধ্যমে নফসে ইনসানীর কুপ্রবৃত্তি বন্ধ করে রূহে ইনসানীর সুপ্রবৃত্তি জাগ্রত করার জন্য গাউছুল আজম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (কঃ) নির্বিঘ্ন ও সহজসাধ্য মাধ্যম হিসেবে সপ্তকর্ম পদ্ধতি পরিচিত করেছেন।

 

* ফানা আনিল খাল্ক

 

ফানা আনিল খাল্ক বলতে বোঝায়, কারো নিকট কোন প্রকার উপকারের আশা বা কামনা না থাকা। যার ফলে মানুষের মন আত্মনির্ভরশীল হয় এবং নিজ শক্তি সামর্থের প্রতি যথাযথ বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন হয়।

 

* ফানা আনিল হাওয়া

 

ফানা আনিল হাওয়া বলতে বোঝায়, যা না হইলে চলে, সে রকম কাজ ও কথাবার্তা হইতে বিরত থাকা। যার ফলে মানুষের জীবন সহজ ও ঝামেলা মুক্ত হয় ।

 

* ফানা আনিল এরাদা

 

ফানা আনিল এরাদা বলতে বোঝায়, মহান আল্লাহ্‌তায়লার ইচ্ছা শক্তিকেই প্রাধান্য দেওয়া এবং নিজ ইচ্ছা বা বাসনাকে খোদার ইচ্ছার নিকট বিলীন করা যাহার ফলে ছুফী মতাদর্শে তছলিম ও রজা হাছিল হয় ৷

 

* মউতে আবয়্যাজ

 

মউতে আবয়্যাজ বলতে বোঝায়, সাদা মৃত্যূ । যা উপবাস এবং সংযমে আয়ত্ব হয়, যার ফলে মানুষের মনে উজ্জ্বলতা দেখা দেয় ৷ পবিত্র রমজান মাসের রোজা, নফল রোজা ইত্যাদি উপবাস ও সংযম পদ্ধতি ৷

 

 

* মউতে আছওয়াদ

 

মউতে আছওয়াদ বলতে বোঝায় কালো মৃত্যূ যা শত্রুর শত্রুতা ও নিন্দাতে হাছিল হয় । অন্যের সমালোচনার পরে, মানুষ যখন নিজের মধ্যে ঊল্লেখিত সমালোচনার খুঁজে পায় তখন নিজেকে উক্ত দোষ হতে সংশোধনের অনূতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহতায়ালার নিকট ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ পায়। যদি অন্যের আরোপিত দোষ নিজের মধ্যে খুঁজে না পায়, নিজেকে দোষমুক্ত বলে নিশ্চিত হয়, তখন আল্লাহতায়লার নিকট শুকরিয়া আদায়ের মনোবল প্রাপ্ত হইয়া নিজের ব্যক্তিত্বে বিরাট শক্তির সমাবেশ দেখতে পায়৷ আর তখন সমালোচনাকারীকে বন্ধু বুলে মনে হয়৷

 

 

* মউতে আহমর

 

 

মউতে আহমর বলতে বোঝায় লাল মৃত্যূ । এটি কামভাব ও লালসা হতে মুক্তি হাছিল হয় এবং বেলায়ত প্রাপ্ত হয়ে অলীয়ে কামেলদের মধ্যে গণ্য হয় ৷

 

* মউতে আখজার

 

 

মউতে আখজার বলতে সবুজ মৃত্যূ । নির্বিলাস জীবন যাপনে অভ্যস্ত হলে মউতে আখজার হাছিল হয় যার ফলে মানুষের অন্তরে স্রষ্টার প্রেম ভালবাসা ছাডা অন্য কামনা বাসনা থাকেনা । ইহা বেলায়তে খিজরীর অন্তর্গত।

মাইজভান্ডার দরবার শরীফ

এমদাদুল হক মাইজভান্ডারী

আর এই সপ্তকর্ম পদ্ধতি হাছিলের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভ করতে হলে আপনাকে বর্তমানে সাজ্জাদানশীনে দরবারে গাউছুল আজম আলহাজ্ব হযরত মওলানা শাহ সূফী সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী (ম. জি. আ.) এর কাছে গিয়ে বাইত গ্রহন করতে হবে আর বাইত গ্রহন করার পর সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী হবেন আপনার পীর আর আপনি আপনার পীরের নির্দেশ অনুযায়ী ইবাদত করতে পারলে তবেই আপনার দ্বারা সপ্তকর্ম পদ্ধতি হাছিল করা সম্ভব।

Share this Story
Load More Related Articles
Load More By Muhammad Sabbir Alam
Load More In মাইজভান্ডার দরবার শরীফ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী শাহ্‌ এমদাদিয়া রাজাপুর দায়রা শাখার মাসিক মাহফিল (28/07/2017)

Share

About Muhammad Sabbir Alam

আমি শাহ্‌ সূফী সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারীর গোলাম মিরসরাই উপজেলার মিঠানালা-রাজাপুর দায়রা শাখার সভাপতি মোহাম্মদ কবির আলম ভান্ডারীর ছোট ছেলে মোহাম্মদ সাব্বির আলম। আমি আমার মনিব সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী (ম. জি. আ.) বাবাজানের একজন আদনা গোলাম হওয়ার চেষ্টা করতেছি।

About Author


আমি সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী বাবাজানের একজন এদনা গোলাম হওয়ার চেষ্টা করছি। আর হযরত কেবলার দয়ায় মাইজভান্ডারের গোলামী করার চেষ্টা করছি।