নবুয়ত ও নবীউন

নবুয়ত নবা শব্দ হতে উৎপন্ন ন। যাহার অর্থ সংবাদ দান। নবীউন কর্তৃবাচক ইচম, ইহার অর্থ সংবাদক। খোদাতায়লার আদেশ-নিষেধ সর্ম্পকীত মধ্যস্থতায় নবুয়তকে শ্রেষ্ঠতর নৈকট্যপূর্ন মানবতা বলা যাইতে পারে। নবুয়ত একটি বিশেষ গুন। আল্লাহ যাহাকে পছন্দ করেন তাহাকেই দিয়া থাকেন। ইহা সাধনা করিয়া অর্জন করা যায় না।

নবী দুই প্রকার :

১. মুরসল : যাহার প্রতি কেতাব অবতীর্ন হইয়াছে।
২. গায়র মুরসল : যাহার প্রতি কেতাব অবতীর্ন হয় নাই এবং অগ্রবর্তী মুরসল নবীর অনুবর্তী

নবুয়ত দুই প্রকারঃ

১. নবুয়তে আম্মা : অর্থাৎ যাহা সার্বজনীন বিশ্বমানবতার প্রতি প্রেরিত।
২. নবুয়তে খাচ্ছা : যাহা কোন বিশেষ কওম বা জাতির প্রতি প্রেরিত।
বেলায়ত:

বেলায়ত অলা শব্দ হতে উৎপন্ন। অলা অর্থ নৈকট্য লাভ। ।প্রেম, মহব্বত সম্পর্ক। খোদাতায়লার নিকট-সম্পর্ককে বেলায়ত বলে।

বেলায়ত দুই প্রকারঃ

১. বেলায়তে ঈমানঃ ইহা শুধুমাত্র খোদার সহিত সম্পর্ককে বুঝায়। এই বেলায়তে সমস্থ মোমেনগণ প্রপ্ত হইয়া থাকেন।
২. বেলায়তে এহছানঃ ইহা খোদার সহিত নিকটতম রহস্যপূর্ণ সম্পর্ক ও ক্ষমতাকে বলা হয়। শুধুমাত্র নবী ও অলীগনই ইহা প্রাপ্ত হয়।

অর্জন প্রণালী ভেদে বেলায়ত চার প্রকারঃ

(১) বিল আছালতঃ- অর্থাৎ মূলগত বা প্রকৃতিগত। সূফীদের পরিভাষায় যাহাকে মাদরজাত বা জন্মগত বলা হয়। উহা বিনা রেয়জতে ও পরিশ্রমে খোদার নিকট হইতে নির্দ্ধারিতভাবে লাভ হইয়া থাকে এবং দওরায়ে ছামাবি বা আছমানী গর্দেশ ও প্রাকৃতিক আবর্তন বিবর্তনের সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া এই বেলায়ত নির্দ্ধারিতসময়ে প্রদত্ত হয়।
(২) বিল বেরাছতঃ- অর্থাৎ রূহানী উত্তরাধিকারী রূপে প্রাপ্ত হয়। যাহাকে ছুফী পরিভাষায় বিল অলায়ত বলা হয়।
(৩) বিদ দারাছতঃ- জাহেরী ও বাতেনী শিক্ষা দীক্ষা বা জ্ঞান অর্জনের যে এলমে লদুন্নী হাছেল হয়, তাহাকে বিদ্‌দারাছত বলে।
(৪) বিল মালামাতঃ- অর্থাৎ নফছ ও প্রবৃত্তির বিরূদ্ধাচরন করিয়া যে বেলায়ত হাছেল হয় , ছুফী পরিভাষা মতে হছুলে মোখালেফাত নফ্‌ছ বলা হয়। অর্থাৎ ইন্দ্রীয় প্রবৃত্তীর বিরূদ্ধে সংগ্রাম করিয়া উহাকে কষ্ট দিয়া নীজ আত্মার বশীভূত করিলে যে খোদায়ী শক্তি হাছেল হয় উহাকে বিল মালামাত বলে।
স্তরের দিক দিয়া বেলায়ত তিন স্তরে বিভক্ত।

(১) বেলায়তে ছোগরাঃ- যাহারা বেলায়তী ক্ষমতা লাভে সধারন মোমেনের উর্দ্ধে স্থান পাইয়াছেন।
(২) বেলায়তে ওছতাঃ- যাহারা বেলায়তী ক্ষমতায় ফেরেস্তার উর্দ্ধে মধ্যম মর্যাদা লাভ করিয়াছেন।
(৩) বেলায়তে ওজমা বা কোবরাঃ- যাহারা বেলায়ত অর্জনে সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রাপ্ত হইয়াছেন। তাহারা সমস্ত সৃষ্ট জগতে ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারে সক্ষম থাকেন। উক্ত বেলায়ত মর্যাদা প্রাপ্ত অলী কে বেলায়তে ওজমার অধিকারী বা শ্রেষ্ট অলী বলা হয়।
এই বিবিধ স্তরের অলী উল্লাহ্‌দের মসরবকে কুতুবিয়ত (কর্ম কর্তৃত্ব) ও গাউছিয়ত (ত্রান কর্তৃত্ব ) নামে দুই ভাগে বিভক্ত করা হইয়াছে।

গাউছিয়ত- বা ত্রানকর্তৃত্বে সর্বোচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন অলীকে গাউছুল আজম বলা হয়। তিনি বিল আছালত বা প্রকৃতিগত ওজন্মগতভাবে অলী হন এবং আল্লাহ্‌তায়লার হুকুমে সৃষ্টির মঙ্গলময় ত্রানকর্তারূপে আবির্ভূত হন।
কুতুবিয়ত- বা কর্ম কর্তৃত্বে সর্বোচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন অলীকে কুতুবুল আকতাব বলা হয়। তিনি আল্লাহ্‌র হুকুমে সৃষ্টীর শৃঙ্খলা বিধানের সর্বময় কর্মকর্তারূপে বিরাজমান থকেন।
তথ্যসুত্রঃ- বেলায়তে মোত্‌লাকা

তাসাওউফ (সুফীবাদ বা সুফী দর্শন ) :

সূফীবাদ একটি ইসলামি আধ্যাত্মিক দর্শন। আত্মা সম্পর্কিত আলোচনা এর মুখ্য বিষয়। আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনই হলো এই দর্শনের মর্মকথা। পরম সত্তা মহান আল্লাহ কে জানার এবং আকাঙ্খা মানুষের চিরন্তন। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আধ্যাতিক ধ্যান ও জ্ঞানের মাধ্যামে জানার প্রচেষ্টাকে সূফী দর্শন বা সূফীবাদ বলা হয়।হযরত ইমাম গাজ্জালী(রঃ)এর মতে, “আল্লাহর ব্যাতীত অপর মন্দ সবকিছু থেকে আত্মাকে প্রবিত্র করে সর্বদা আল্লাহর আরাধনায় নিমজ্জিত থাকা এবং সম্পূর্ন রূপে আল্লাহুতে নিমগ্ন হওয়ার নামই সূফী বাদ বলে। “‘সুফ অর্থ পশম আর তাসাওউফের অর্থ পশমী বস্ত্রে পরিধানের অভ্যাস (লাব্‌সু’স-সুফ) – অতঃপর মরমীতত্ত্বের সাধনায় কাহারও জীবনকে নিয়োজিত করার কাজকে বলা হয় তাসাওউফ। যিনি নিজেকে এইরূপ সাধনায় সমর্পিত করেন ইসলামের পরিভাষায় তিনি সুফি নামে অভিহিত হন। ইসলামি পরিভাষায় সুফিবাদকে তাসাওউফ বলা হয়, যার অর্থ আধ্যাত্মিক তত্ত্বজ্ঞান। তাসাওউফ বা সুফিবাদ বলতে অবিনশ্বর আত্মার পরিশুদ্ধির সাধনাকে বুঝায়। আত্মার পবিত্রতার মাধ্যমে ফানাফিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে অবস্থান করা) এবং ফানাফিল্লাহর মাধ্যমে বাকাবিল্লাহ (আল্লাহর সঙ্গে স্থায়িভাবে বিলীন হয়ে যাওয়া) লাভ করা যায়। যেহেতু আল্লাহ নিরাকার, তাই তাঁর মধ্যে ফানা হওয়ার জন্য নিরাকার শক্তির প্রতি প্রেমই একমাত্র মাধ্যম। তাসাওউফ দর্শন অনুযায়ী এই সাধনাকে ‘তরিকত’ বা আল্লাহ-প্রাপ্তির পথ বলা হয়। তরিকত সাধনায় মুর্শিদ বা পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন হয়। সেই পথ হলো ফানা ফিশ্‌শাইখ, ফানা ফিররাসুল ও ফানাফিল্লাহ। ফানাফিল্লাহ হওয়ার পর বাকাবিল্লাহ লাভ হয়। বাকাবিল্লাহ অর্জিত হলে সুফি দর্শন অনুযায়ী সুফি আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ শক্তিতে শক্তিমান হন। তখন সুফির অন্তরে সার্বক্ষণিক শান্তি ও আনন্দ বিরাজ করে।হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) স্বয়ং সুফিদর্শনের প্রবর্তক। তিনি বলেন, মানবদেহে একটি বিশেষ অঙ্গ আছে, যা সুস্থ থাকলে সমগ্র দেহ পরিশুদ্ধ থাকে, আর অসুস্থ থাকলে সমগ্র দেহ অপরিশুদ্ধ হয়ে যায়। জেনে রাখো এটি হলো কল্‌ব বা হৃদয়। আল্লাহর জিকর বা স্মরণে কল্‌ব কলুষমুক্ত হয়। সার্বক্ষণিক আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে কল্‌বকে কলুষমুক্ত করে আল্লাহর প্রেমার্জন সুফিবাদের উদ্দেশ্য। যাঁরা তাঁর প্রেমার্জন করেছেন, তাঁদের তরিকা বা পথ অনুসরণ করে ফানাফিল্লাহর মাধ্যমে বাকাবিল্লাহ অর্জন করাই হলো সুফিদর্শন। সুফিবাদ উৎকর্ষ লাভ করে পারস্যে। সেখানকার প্রখ্যাত সুফি-দরবেশ, কবি-সাহিত্যিক এবং দার্শনিকগণ নানা শাস্ত্র, কাব্য ও ব্যাখ্যা-পুস্তক রচনা করে এই দর্শনকে সাধারণের নিকট জনপ্রিয় করে তোলেন। কালক্রমে বিখ্যাত ওলীদের অবলম্বন করে নানা তরিকা গড়ে ওঠে। সেগুলির মধ্যে কয়েকটি প্রধান তরিকা সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করে:
গাউছুল আজম বড় পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রঃ) প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া তরিকা,
সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মু’ঈনুদ্দীন চিশতি (রঃ) প্রতিষ্ঠিত চিশতিয়া তরিকা,
গাউছুল আজম হযরত আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া মাইজভান্ডারীয়া তরিকা,
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দী (রঃ) প্রতিষ্ঠিত নকশবন্দিয়া তরিকা এবং
হযরত শেখ আহমদ মুজাদ্দিদ-ই-আলফে ছানী সারহিন্দী (রঃ) প্রতিষ্ঠিত মুজাদ্দিদিয়া তরিকা।

Share this Story
Load More Related Articles
Load More By Muhammad Sabbir Alam
Load More In সকল পোষ্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also

গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী শাহ্‌ এমদাদিয়া রাজাপুর দায়রা শাখার মাসিক মাহফিল (28/07/2017)

Share

About Muhammad Sabbir Alam

আমি শাহ্‌ সূফী সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারীর গোলাম মিরসরাই উপজেলার মিঠানালা-রাজাপুর দায়রা শাখার সভাপতি মোহাম্মদ কবির আলম ভান্ডারীর ছোট ছেলে মোহাম্মদ সাব্বির আলম। আমি আমার মনিব সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী (ম. জি. আ.) বাবাজানের একজন আদনা গোলাম হওয়ার চেষ্টা করতেছি।

About Author


আমি সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী বাবাজানের একজন এদনা গোলাম হওয়ার চেষ্টা করছি। আর হযরত কেবলার দয়ায় মাইজভান্ডারের গোলামী করার চেষ্টা করছি।